সেবারই প্রথম বিশ্বকাপ দেখা গেলো রঙিন পর্দায়!


ফুটবল তখন ছড়িয়ে দেওয়ার পালা। জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নিচ্ছিলো ফিফা। সে কারণেই হবে হয়তো। ইউরোপ-দক্ষিণ আমেরিকার শক্ত বেড়াজাল ছিঁড়ে বিশ্বকাপ চলে এলো উত্তর আমেরিকায়।

প্রথম হওয়ার হিসেবের খাতাটা এখনই বন্ধ করলে চলবে না। এই প্রথমবারের মতো খেলোয়াড় পরিবর্তনের ধারাটির প্রচলন করলো ফিফা। প্রতি দল দুজন খেলোয়াড় বদলাতে পারবে! এটাই হলো নিয়ম। এবারই প্রথম চালু হলো ‘ফেয়ার প্লে’ ট্রফি। পরিষ্কার আর পরিচ্ছন্ন খেলার জন্য দেওয়া হবে এটি।

লালকার্ডের প্রচলন থাকলেও এই বিশ্বকাপে কোনো খেলোয়াড়কে মাঠের বাইরে যেতে হয়নি।
কোন পরিবর্তন নেই খেলার ধরনে। আজব কিছু কাণ্ড হয়েছিলো সেবার। যেমন ধরুণ ইংলিশ ক্যাপ্টেনের জেলে যাওয়ার বিষয়টিই। চুরির দায়ে বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে জেলে যেতে হয়েছিলো ইংল্যান্ড অধিনায়ক ববি মুরকে! তাকে ছাড়া হয়েছিলো, তবে ততক্ষণে ইংল্যান্ড দল রওনা হয়ে গেছে।

ইউরোপকে বিশ্বকাপ ফুটবলে সব সময়ই বেশি পাত্তা দেওয়া হয়। আর যে কারণে ইউরোপের মানুষের খেলা দেখার সুবিদার্থে সেবার খেলাগুলো নেওয়া হয়েছিলো দুপুরের দিকে! বিষয়টি বেশ নাখোশ করেছিলো খেলোয়াড়-কর্মকর্তাদেরকে। কেননা ওই সময় মেক্সিকোতে দিনের বেলায় কড়া রোদ পড়তো।

ইংল্যান্ড-ব্রাজিলের ম্যাচের ঠিক কিছু সময় আগে ব্রাজিলের সমর্থকরা সারারাত উচ্চস্বরে গান গেয়েছে। তাও কোথায় জানেন, যে হোটেলে ইংলিশ ফুটবলাররা ঘুমিয়েছিলো তার বাইরে। যেন তাদের ঘুমের সমস্যা হয়! এই বিশ্বকাপের কোয়ালিফাইংয়ের সময়ও মজার সব কাণ্ড ঘটেছিলো। বলা যায়, জাম্বিয়া-সুদানের ম্যাচটির কথাই। দুই দলই তাদের নিজ নিজ হোম ম্যাচে ৪-২ গোলের জয় পেয়েছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুদান পরের রাউন্ডে উঠেছিলো হঠাৎ নেওয়া এক সিদ্ধান্তে।

সেই সিদ্ধান্ত ছিলো, যেখানে বলা হয়েছিলো যে, যে দলটি দ্বিতীয় ম্যাচে বেশি গোল করবে তারাই জয় লাভ করবে। সেই হিসেবে সুদান পরের রাউন্ডে গেলেও শেষ পর্যন্ত পায়নি বিশ্বকাপ খেলার টিকেট। প্রথম হওয়ার দৌঁড়ে আরেকটি বিষয় যোগ হয় এবার। ব্রাজিলিয়ান মারিও জাগালো প্রথম ব্যক্তি যিনি খেলোয়াড় (১৯৫৮) ও কোচ হিসেবে জেতেন বিশ্বকাপ।

আর পেলে প্রথম ফুটবলার হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ জেতা দলে ছিলেন যিনি।
একটা খারাপ ঘটনাও ঘটে। তবে বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়ে নয়, পরে। আনন্দ উল্লাস করার সময় বিশ্বকাপটা হাতছাড়া হয়ে যায়। কোথায় যেন হারিয়ে যায়। পরে ব্রাজিলিয়ানরা তা উদ্ধার করে একজন খুদে সমর্থকের কাছ থেকে!

আহ! রঙিন পর্দায় ফুটবল। মাঠে না গিয়েও তাই এবার প্রচুর পরিমানে দর্শক থাকে টেলিভিশনের সামনে। ওহ! আরো একবার পেলেকে বলতে হলো, এই বিশ্বকাপের পর আর তিনি বিশ্বকাপ খেলবেন না। তবে ব্রাজিলীয় দলটি সেবার ছিলো অনন্য সাধারণ। কেন? পেলে থেকে শুরু করুন।

এরপর ছিলেন উইংগার জার্জিনহো আর রিভেলিনো। প্লে-মেকার গারসন। মিডফিল্ডার ক্লোডোয়ালডো আর অ্যাটাকিং ফুলব্যাক ও ক্যাপ্টেন কর্লোস আলবের্তো। এর বাইরে সেন্টার ফরোয়ার্ড টোস্তাও ছিলেন। আর কী লাগে ব্রাজিলের।

সোভিয়েন ইউনিয়ন, মেক্সিকো, বেলজিয়াম ও এল-সালভাদর নিয়ে এক নম্বর গ্রুপ এবং দাপুটে খেলে এই গ্রুপ থেকে পরের পর্বে পৌঁছে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন আর মেক্সিকো। কে জানে দুই নম্বর গ্রুপটাই সম্ভবত সবচে সহজ। ইতালি ছাড়া উরুগুয়ে, সুইডেন আর ইসরাইল! অথচ জানেন, ওই ইসরাইলের কাছেই ঠেকে গিয়েছিলো ইতালি আর সুইডেন। গোলশুন্য ড্র হয় ইংল্যান্ডের ম্যাচ আর সুইডেনের সঙ্গে ১-১! আর এই ড্রয়ে তো শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় পর্বেই পা ফেলা হলোনা সুইডিশদের। গ্রুপ থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ইতালি আর রানার্সআপ হয়ে পরের পর্বে যায় উরুগুয়ে।

আর সেই ব্রাজিলের সঙ্গেই গ্রুপ পর্বে খেলতে নামতে হয় ইংল্যান্ডকে। অনেকে মন্তব্য করেছিলেন, যাক ফাইনালের ড্রেস রিহার্সলটা হয়েই গেলো! জার্জিনহোর গোল এগিয়েই দিয়েছিলো ব্রাজিলকে। কিন্তু তারপরও ম্যাচটাকে মনে রাখতে হবে গর্ডন ব্যঙ্ককে। পেলের ওই রকম বুলেট গতির হেড যে ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন! ব্রাজিলের সঙ্গে একমাত্র গোলে হারলেও তিন নম্বর গ্রুপ থেকে ইংল্যান্ডও পরের পর্বে উঠেছিলো; রোমানিয়া ও চেকোশ্লোভাকিয়াকে ওই ব্যবধানে হারিয়েই।

চার নম্বর গ্রুপে বলার মতো তেমন কিছু ঘটেনি। পশ্চিম জার্মানি নিজেদের ঢংয়ের ফুটবল খেলে তিন ম্যাচের তিনটিই জিতে চলে যায় পরের রাউন্ডে। এই গ্রুপ থেকে তাদের সঙ্গী পেরু। পশ্চিম জার্মানির কাছে হারলেও বুলগেরিয়া ও মরোক্কোকে হারায় তারা। মজার ব্যাপার হলো, তৃতীয় ও চতুর্থ দল বুলগেরিয়া ও মরোক্কো নিজেদের মধ্যকার ম্যাচও জিততে পারেনি।

নক-আউট পর্বের শুরুতেই কোয়ার্টার ফাইনাল; একই দিনে হয় চারটি ম্যাচ। এর মধ্যে উরুগুইয়ানদের হাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পরাস্ত হওয়ার ঘটনা সম্ভবত ওই সময়ের সংবাদপত্রে সিঙ্গেল কলামে জায়গা পেয়েছিলো। কেননা বাকি ম্যাচ তিনটি বড়ই ফাইটিং।
যার একটিতে মুখোমুখি পশ্চিম জার্মানি আর ইংল্যান্ড। যেন ৬৬’র বিশ্বকাপের ফাইনাল। এ ম্যাচেই প্রতিশোধের সুযোগ জার্মানদের সামনে। এবং সেখানে সফলও হয় তারা।

বেকেনবাওয়ার, সেলের আর মুলারের গোলে ইংলিশদের হারিয়ে দেয় জার্মানরা। ফল ৩-২। ইংল্যান্ডের হয়ে গোলদুটি করেন মুলেরী আর পিটারস। ব্রাজিল-পেরু ম্যাচটিও একেবারে খারাপ হয়নি। পয়সা উসুল হয় দর্শকদের। ম্যাচ ছিলো ছয় গোলের। এর মধ্যে ব্রাজিল করে ৪টি আর পেরু ২টি। ব্রাজিলের হয়ে দুটো করেন টোস্টাও। বাকি দুটি রিভেলিনো আর জার্জিনহোর।

কোয়ার্টার ফাইনালের অন্য ম্যাচটি এ দুটোর তুলনায় এক তরফাই। ইতালির সামনে দাড়াতেই পারেনি মেক্সিকানরা। উড়ে গেছে ৪-১এ। ইতালির হয়ে রিভার দুটি আর পেনা ও রিভেরা করেন একটি করে গোল। শেষ চারের খেলা দুটোও হয় একই দিনে। ১৭ই জুনের এক ম্যাচে মুখোমুখি ব্রাজিল আর উরুগুয়ে। ম্যাচের ফল কি হতে পারে তা নিশ্চয় বলে দিতে হবে না। শুধু গোল সংখ্যাটাই বলে দিই। ম্যাচের স্কোর লাইন ৩-১।

দ্বিতীয় ম্যাচটা অবশ্য জমেছিলো বেশ। ম্যাচ ছিলো ৭ গোলের। স্কোর লাইন ৪-৩ এবং সেটা ইতালিয়ানদের পক্ষে। যদিও নির্ধারিত সময়ের পুরোটাই ছিলো, সমানে সমান। টান টান উত্তেজনার ওই ম্যাচের নির্ধারিত সময় শেষ হয় ১-১এ। মাত্র আট মিনিটেই বোনিনসেগনা এগিয়ে দিয়েছিলো ইতালিয়ানদের। আর খেলার ঠিক শেষ মিনিটে স্নেলিংগার শোধ করে দেন পশ্চিম জার্মানদের হয়ে। ব্যস খেলা অতিরিক্ত সময়ে। আসলে খেলাটা ওই সময়ই জমেছিলো ভালো।

অতিরিক্ত সময়ে খেলোয়াড়রা দূর্বল হবে কী যেন প্রাণ ফিরে পেলো। উত্তজনা ছড়ালো মাঠ থেকে গ্যালারী পর্যন্ত। এবারে আগে গোল করে জার্মানরা। ৯৪ মিনিটে মুলার। তবে চার মিনিট বাদেই ইতালির হয়ে স্কোর সমান করে বার্গনিচ। এবার আবারও এগিয়ে যায় ইতালি, খেলার ১০৪ মিনিটের মাথায় গোল করেন রীভা। ছ’মিনিট পর আবারও সমতা। জার্মানদের খেলায় রাখেন আবারও ওই মুলার। কিন্তু ওই আনন্দ এক মিনিটও স্থায়ী হতে দেননি ইতালির রিভেরা। তারপর আর গোল হয়নি। ফাইনালে জায়গা করে নেয় আজ্জুরিরা।

আর ফাইনাল? যতটা ভাবা হয়েছিলো, মোটেও তেমন হয়নি। হতেই দেয়নি সাম্বার দেশের ফুটবলাররা। পুরো একতরফা খেলায় জিতেছে ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপের শিরোপা। ইতালিয়ানদের কফিনে পেরেক ঠোকা শুরু করেন কালো মানিক পেলে, খেলা তখন মাত্র ১৮ মিনিট গড়িয়েছে। কিন্তু শোধ করে দেন বোনিনসেগনা। প্রথমার্ধ সমতা নিয়ে মাঠ ছাড়ে দু’দল। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে যেন দম ফিরে পায় ব্রাজিলিয়ানরা। যখন ফিরে আসে তখন তাদের কাছে আর পাত্তাই পায়নি আজ্জুরিরা। একে একে গারসন, জার্জিনহো আর কার্লোস আলবের্তো বাকি পেরেকগুলো ঠূঁকে বন্ধ করে দেন আজ্জুরিদের কফিন। শুরু হয় সাম্বা। তৃতীয় বারের মতো ব্রাজিলিয়ানদের হাতে ওঠে বিশ্বসেরার মুকুট।